সে তাে আজকে নয়: মেয়েদের দুরের যাত্রার উদ্যাপন।
 সে তাে আজকে নয়: মেয়েদের দুরের যাত্রার উদ্যাপন।
পূর্বঘাট পর্বতমালার খ্যাতিহীন কিছু পাহাড়শ্রেণি — সাস বহু মালি, বাফলি মালি — তাদের কোল ঘেঁষে উচ্চাবচ পথ চলেছে । সেই পথে চার কিলােমিটার পায়ে হেঁটে প্রাথমিক স্কুলে আসে বালিকা পিঙ্কি । শীতের সকালে তাপাঙ্ক শূন্য ছুঁইছুই । সাতপুরনাে সােয়েটারের নীচে বাড়ির জামা নতুন স্কুলের পােশাক তৈরি হতে আরও দশ দিন । জুতােও আসবে শিগ্নিরই । তার পায়ের মাপে দলিত ঘরের সাত বছরের মেয়ে এত পথ হাঁটে কারণ, তার নিজের গ্রামের স্কুলের মাস্টারমশাইরা তাকে ভালবাসেন না । পিঙ্কি আর তার মতােদের বাইরে বসতে হয় । মিড ডে । খাবার ছুড়ে দেওয়া হয় উপর থেকে ।

ছােট হলেও বালিকা বােঝে, একসঙ্গে পাশাপাশি বসে মাণ্ডিয়া খিচুড়ি খাওয়ার আরাম, ক্লাসে গল্প বলার পর গুরুমা বা টিচারের । কাছ থেকে পাওয়া আদরের মানে । ওড়িশার রায়গড়া জেলার পর্বত । জঙ্গলাকীর্ণ বিজনতার মধ্যে কোনও সরকারি সহায়তা ছাড়া গড়ে ওঠা স্কুলটি চালায় পুরনাে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা অগ্রগামী । দলিত শিশুকন্যাদের জন্য এই দিবা স্কুলে গােড়ায় আদিবাসীরা তাদের মেয়েদের পাঠাতে চাইছিল না । কিন্তু শিক্ষাদানের মান দেখে তারাও নিজেদের মনের বাধা অতিক্রম করেছে । কিছুদিন পর স্কুলের গাড়ি পিঙ্কিদের বাড়ি গিয়ে নিয়ে আসবে ।

পিঙ্কি ভাল আছে । পড়াশােনায় তার ও অন্য সহপাঠীদের এগিয়ে তাক লাগানাের মতাে । পিঙ্কি জানে না উত্তরাখণ্ডের এক গ্রামে গত ছ' মাসে একটিও শিশুকন্যা জন্মায়নি৷ কন্যাভ্রণ নিমূর্লন যজ্ঞে যােগ অজাত শিশুর পরিবার, শিক্ষিত ডাক্তারবাবুরা এবং আইনের মুখে ছাই দেওয়া প্রশাসন । জন্মের লগ্নেই একহাজার শিশুপুত্রের তুলনায় একশাে চারজন মেয়ে কম জন্মায় এদেশে । পৃথিবীর আলাে দেখার আগেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় তারা । আর, জন্ম থেকে ছ ’ বছর পর্যন্ত কন্যা ও পুত্রসন্তানের অনুপাত কমে চলেছে সেই ১৯৪১ থেকেই । মারাঠওয়াড়ার বৃষ্টিবিরল অঞ্চলে মেয়েরা সুরক্ষিত নয় । বিয়ের যৌতুক বাড়ছে । কন্যাভ্রুণ নির্মলন এখানে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা । কলকাতার । শিক্ষিত উচ্চ মধ্যবিত্ত অঞ্চলও ক্রমহ্রাসমান কন্যাসন্তানের অনুপাত নামক ব্যাধির ব্যতিক্রম নয় । যে মেয়ে ষড়যন্ত্রের ফাঁক ফোকর গলে কোনওমতে জন্ম নিল, অযত্ন, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, চিকিৎসার সুবিধে থেকে তাকে দূরে রেখে ক্রমশ নির্মূল করা । তাতে পিঙ্কিদের বয়েই গেল । তারা বেঁচেবর্তে আছে, পড়াশােনা শিখবে বলে পায়ে হাঁটছে, এটাই তাে আজকের তাজা খবর । মেয়েদের এগােনাের লড়াই, এ লড়াই তাদের হবে । আন্তর্জাতিক নারীদিবসে এটাই সবচেয়ে জরুরি খবর ।

শাহিন বাগের মেয়েদের সঙ্গে কথা বলার জন্য উচ্চতম ন্যায়ালয় দু’জন প্রতিনিধি পাঠিয়েছেন। দু’মাস তীব্র শীত, অসুখ, মৃত্যু পার হয়ে যে-জমায়েত চলছে, তার কণ্ঠস্বর শেষপর্যন্ত কোথাও পৌঁছল। এগিয়ে যাবার জন্য মেয়েদের বেঁচে থাকা খুব দরকারি, কারণ তারা একা বাঁচতে জানে না। পরিবার পরিজন সন্তানসন্ততি সকলকে নিয়ে তাদের জীবনধারণ।। জ্বালানি কাঠ বন থেকে আনবে কারা? কেন, মেয়েরা। রাঁধবে, বাসন মাজবে, কাপড় কাচবে কে? মেয়েরা, আবার কে? বীজ বােনা, চারা রােপণ, ফসল নিড়ােনাে, কাটা, ঝাড়াই-বাছাই সবেতেই মেয়েরা পুরুষদের পাশে। কালাহান্ডির হাটে দেখেছি পিঠের ঝােলায় শিশুকে নিয়ে মহুয়া, তেঁতুল, করঞ্জ বীজ বিক্রি করতে বসেছে মেয়ে, পতিদেবতাটি কাঁচা শালপাতার চুট্টা ধরিয়ে বউয়ের মাথায় ছাতা ধরে আছে। শ্রমের বিভাজন দেখলে চোখ জুড়ােয়। নিজের ভিটেয় বসে লড়াই যেখানে এত কঠিন, সেখানে নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে না পেরে উৎখাত হয়ে কয়েদখানায় ঢুকলে ছারখার হয়ে যাবে বহু প্রজন্মের পরিবার । সেই সব ভাঙাচোরা সংসারের টুকরাে বুকে তুলে নিয়ে আবার লড়াই আরম্ভ । শাহিন বাগের মেয়েরা জানেন, এবার তাঁদের দেওয়ালে পিঠ । কাজেই দাঁতে দাঁত চেপে শীত সহ্য করে বসে থাকতে হবে এখনও ।

নাগরিকত্ব বহাল অবস্থাতেই জমি থেকে উৎখাত হওয়ার ঘটনা তাে কম দেখেনি মেয়েরা । বাপ পিতেমার ঘর ছেড়ে উন্নয়নের নামে ছাওয়া ক্যাম্পে নতুন সংসার দায়িত্ব, সেও তাে মেয়েদেরই । পুরনাে ঘরের কাছে নদী ছিল, এখানে নেই । ওপাড়ায় আম তেঁতুলের গাছ ছিল অনেকগুলি, এখানে সদ্য চারা লাগানাে হয়েছে । সব সাজিয়েগুছিয়ে নিয়ে আবার বসা । ইন্দ্রাবতীর বাঁধের জলে জমি হারিয়ে নতুন জায়গায় এল যে পরজা আদিবাসী পরিবার, তাদের আবার উঠতে হল কারণ, জমির নীচে ঠাসা বক্সাইটের খবর পাওয়া গেছে । কাজেই আবার ওঠা । এমন শত শত পরিবারের মেয়েদের লড়াইয়ের খবর কোথাও ছাপা হয় না ।

উষ্ণায়ন, পরিবেশের বিপন্নতার প্রথম অভিঘাত এসে পড়ে মেয়েদের উপর । জলস্তর নেমে যাচ্ছে, নদী শুকিয়ে যায় । ইদারায় জলপাত্রের দীর্ঘ মিছিল যেন তৃষ্ণার্ত আত্মার হাহাকার । কলসি নিয়ে জলের খোঁজে আরও পথ হাঁটা । গাছ তাে যতক্ষণ পারে শিকড় দিয়ে মাটি আঁকড়ে থাকে, কিন্তু সংঘবদ্ধ কাঠ পাচারের দল অথবা ঠিকাদার বাহিনীর কাছে তারা অসহায় । অন্যদিকে, অরণ্যনির্ভর আদিবাসীর জীবনকে ক্রমশ সীমাবদ্ধ করে দেওয়ার ভূমিকা নেয় অরণ্য সংরক্ষণ আইন । সেই আইনের মহিমায় শুকনাে জ্বালানি কাঠ খুঁজে আনতে মেয়েদের আরও পথ হাঁটতে হয়, অরণ্যজাত হরীতকী আমলকী কুল শালবীজ যা বেচে বর্ষার আগে তাদের অভাবের সংসার চলে, তার জোগানে টান পড়ে ।

articleRead

You can read upto 3 premium stories before you subscribe to Magzter GOLD

Log-in, if you are already a subscriber

GoldLogo

Get unlimited access to thousands of curated premium stories and 5,000+ magazines

READ THE ENTIRE ISSUE

March 02, 2020