মানিকদার সােল্লাস হাততালি
Desh|May 02, 2021
অ ন্ধকার প্রেক্ষালয়ে পা দিতে না দিতেই কোনও এক অচেনা দর্শক-বন্ধুর হাত আমায় টেনে নিয়ে পাশের চেয়ারে বসাল। সামনের দিকে তাকিয়েও বুঝতে পারছি, পরদায় তখন কী দেখানাে হচ্ছে, বুঝতে পারছি আর কতটুকুই বা আয়ু আছে ছবিটার! চলমান ছবিতে তখন দুঃখ-সুখের এমনই দোলদোলানি, মুহূর্তের জন্যেও নাড়াঘাঁটা করার সাহস হল না। কে আমার সঙ্গী হলেন, সেই অন্তিম লগ্নে কেই-বা সে হিসাব নেয়!
ম নােজ মিত্র

চিত্রপরিচালক তপন সিংহ গতকাল শেষ মুহূর্তে বারবার বলেছিলেন, যতই কাজ থাক কাল একবার আসবেনই। জীবনের প্রথম ছবির প্রথম প্রদর্শনীটি মিস করবেন না। এ সুযােগ জীবনে কিন্তু দ্বিতীয়বার পাবেন না ভাই।

সমুদ্রযাত্রা কি বিমানযাত্রার আগে যেমন আমরা বন্দরে উপস্থিত হয়ে দূরযাত্রী প্রিয়জনের মঙ্গল কামনা করি, এক্ষেত্রেও তাই, আমরা আমাদের বাঞ্ছারামের বাগানএর লেখক-শিল্পী-প্রযােজক-পরিচালক থেকে ওই দুয়ারে দাঁড়িয়ে থাকা বাহাদুর ছেলেটার সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করছি— এটুকু আমাদের শেষ এবং অবশ্য কর্তব্য।

ছবি শেষ হয়েছে। প্রেক্ষাগৃহের আলাে একে একে জ্বলে উঠছে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু ক্ষণে ক্ষণে নীরব হাসিতে মেঘ ও রৌদ্রের লুকোচুরি নিয়ে দ্রুতপায়ে বাইরের দরজার দিকে অগ্রসর হচ্ছেন। তপনদার প্রধান সহকারী বলাই সেন, নিজেও কেদার রাজা প্রমুখ কয়েকটি ছবির নির্মাতা, দুধারের দর্শকাসনের মাঝখান দিয়ে

কাউকে খুঁজতে খুঁজতে এগিয়ে চলেছেন— একবার আমার গলার ‘বলাইদা শােনামাত্র খপ করে কবজি পাকড়ে ধরেছেন আমার, “আরে এইখানে লাজুক মুখে বইসা কী করেন, আসেন ছবির জগতের ওপর-মহলের কর্তাদের শুভেচ্ছা কুড়াবেন আসেন।

শেষের কথাগুলাে সবার জন্যে নয় অবশ্যই। বলাইদা আমায় টেনে এনে দাঁড় করালেন যেখানে, সেখানে তখন উপস্থিত সত্যজিৎ রায় তপন সিংহ এবং চিত্রজগতের স্বনামধন্য অনেকানেক শিল্পী কলাকুশলীরা।

সত্যজিৎ রায় দৃষ্টি ঘােরালেন: তুমি! তুমি করলে বাঞ্ছারাম? একটা বাচ্চাকে বুড়াে বানালে—কী হে অনন্ত, ক্রেডিটটা কার? তােমার না তােমার বন্ধুর?

অনন্ত দাস, যাঁর খ্যাতি পরিচিতি সত্যজিৎ রায়ের মেকআপ আর্টিস্ট হিসেবে। বুঝলাম, ইতিমধ্যে অনন্ত দাস আমাদের চেনা-পরিচয়ের কথা শুনিয়েছে তার মানিকদার কাছে।

অনন্ত বলছে, না না আমি না মানিকদা, এ ছবির মেকআপ শক্তি সেনের।

সত্যজিৎ রায় মুখে মুখে হিসাব করতে লাগলেন, বছর তিন-চার বাদে যখন আমি ঘরে-বাইরে ছবিটা বানাতে যাচ্ছি, তােমার বয়স হচ্ছে তেতাল্লিশচুয়াল্লিশ। স্বাভাবিক অবস্থায় মােটামুটি একই চেহারায় থাকবে। তবে মাস্টারমশাই অবশ্য ষাট বছরের হলেও ক্ষতি নেই। তবে আমি আজকে বুঝলাম, অল্পবয়সিরাই বার্ধক্যের বােঝা অনায়াসে মহানন্দে বহন করতে পারে, করেও। ষাট-সত্তরের মানুষ বাঞ্ছারামের শারীরিক ধকলটা সহ্য করতে পারত না। প্রতি মুহূর্তে যে শরীরের কথা ভাবত, সে বুড়ােবয়সের ধকল বহন করতে পারবে? অসম্ভব! তাহলে তােমাকে মাথায় রেখেই আমি এগিয়ে যাই, কী বলাে? বৃদ্ধ চরিত্রের জন্যে বৃদ্ধ শিল্পী খোঁজাটা কোনও কাজের কথা নয়। বরং তরুণদের খুঁজে নিলে দুকুল রক্ষা পায়। ঠিক কি না?

আমার মুখ দিয়ে শুধু বেরিয়েছে, হ্যাঁ স্যার। সঙ্গে সঙ্গে ধমক জুটল প্রথম দিনেই।

ও আবার কী কথা, হ্যাঁ স্যার, না স্যার! কক্ষণও স্যার-ট্যার বলবে না। মানিকদা... মানিকদা বলে ডাকবে।

মাস দুই বাদে একদিন অনন্তর সঙ্গে গেলাম বিশপ লেফ্রয় রােডে মানিকদার বাড়িতে। বাড়িটা বিশাল। কয়েক তলা পেরিয়ে পৌঁছতে হয় মানিকদার দুয়ারের সামনে। বনেদি বাড়ি— লম্বা চওড়া কাঠের সিঁড়ি। অনন্ত যে তলায় আমায় দাঁড় করাল, তার দরজার মাথার ছিটকিনিটা ডিঙি দিয়েও ছুঁতে পারব না। অনন্ত দাসের সব চেনা। আর ও ছিল আমার চেয়ে লম্বায়। খাটো। তাই মাথার ছিটকিনি ধরাও সম্ভব নয়। খামােকা হাত না বাড়িয়ে আঙুলের গাঁট দিয়ে সপাটে আওয়াজ তুলল কপাটে— ঠক ঠক ঠক। একটু পরেই দরজা খুলে গেল। বাড়ির কাজের ছেলেটাকে অনন্ত আমার নামটা বলে বলল, বলাে গিয়ে দেখা করতে এসেছেন। সে এক পাক ঘুরে এসে বললে, আপনাদের বসতে বললেন।

ঢুকেই থমকে আছি। ঘরখানায় মাথায় মাথায় এক দঙ্গল বইয়ের আলমারি। ঘরের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে পৌঁছতে ডাইনে-বাঁয়ে ঘন ঘন দিক বদল করতে হয়। অনন্তর সব জানা। সেই অশনি সংকেত থেকে মানিকদার। এক নম্বর মেকআপ আর্টিস্ট। ওর পিছু ধরে অনায়াসে ঘরের ওপ্রান্তে পৌঁছলাম। কী জানি, ও না থাকলে পথের মাঝে একা পথ হারিয়ে হয়তাে দাঁড়িয়েই থাকতাম এক ঠাঁই।

Continue reading your story on the app

Continue reading your story in the magazine

MORE STORIES FROM DESHView All

পিছনের দিকে এগিয়ে যান

ডাক্তারি পরীক্ষায় পাশ করার পরে বিভিন্ন বিষয়ে হাতেকলমে কাজ শিখতে হয় হবু চিকিৎসকদের, যার নাম ‘রােটেটিং ইনটার্নশিপ। মেডিসিন, শল্যচিকিৎসা, স্ত্রী-রােগ, চোখ, নাক-কান-গলা ইত্যাদি বিভাগে কাজ করার পরেই এমবিবিএস ডিগ্রিটি মেলে। চিকিৎসা বিষয়ক নিয়ামক সংস্থা ‘ন্যাশনাল মেডিকাল কমিশন’ গত ৭ জুলাই ‘কম্পালসারি রােটেটিং ইন্টার্নশিপ’ নিয়ে একটি খসড়া প্রস্তাব পেশ করেছেন। খসড়া অনুযায়ী হবু চিকিৎসকদের ‘ইন্ডিয়ান সিস্টেম অফ মেডিসিন’ বা ‘আয়ুষ’-এও এক সপ্তাহের জন্যে বাধ্যতামূলক ইনটার্নশিপ করতে হবে (“আয়ুষ’ শব্দটি এসেছে আয়ুর্বেদ, যােগ, ইউনানি, সিদ্ধা এবং হােমিওপ্যাথি— এই পাঁচটি বিষয়ের আদ্যক্ষর যােগ করে)।

1 min read
Desh
July 17, 2021

হযবরল; কল্পনার মেধাবী স্বেচ্ছাচার সু ম ন গুণ

সুকুমার রায়ের রচনায় ‘আমাদের এই পৃথিবীর ভিতরেই আরও অনেক পৃথিবী’র খোঁজ পেয়েছিলেন জীবনানন্দ দাশ। চিত্ররূপময় সেই ভুবন ‘আমাদের চেনাশােনা পৃথিবী কিংবা তার প্রতিচ্ছবির মতাে বাস্তব না হয়েও তেমনি পরিচিত ও তেমনি সত্য। অতিরিক্ত অথচ অবধারিত সেই সত্যের সদাহাস্যময় বন্দনা সুকুমার রায়ের যে-কোনও লেখার মতােই আমরা পাব হযবরল-তেও, যে-রচনাটি এই বছর শতবর্ষ স্পর্শ করল। এই একশাে বছরে বাংলা সাহিত্য উচ্চাশা ভরা নানা অভিযানে অংশ নিয়েছে,

1 min read
Desh
July 17, 2021

কোভিড-উত্তর বিশ্বে কর্মস্থানের ভবিষ্যৎ সুমি ত মিত্র

মনে পড়ে সত্তরের দশকে যখন কলকাতায় মেট্রো রেলের জন্য খোঁড়াখুঁড়ি শুরু হয়েছে, তখন সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হত শহরের যানবাহনের। ভবিষ্যৎ সম্পর্কে চিন্তাপূর্ণ প্রবন্ধ। ধরেই নেওয়া হত, নগরবাসী বাস করবে টালা থেকে টালিগঞ্জ, এই বৃত্তের মধ্যে এবং তাদের কর্মজগতের কেন্দ্রবিন্দু থাকবে সেই ডালহৌসি-চৌরঙ্গী অঞ্চল।

1 min read
Desh
July 17, 2021

কেন মেঘ আসে হৃদয় আকাশে

সে-যুগে না-হয়ে মেঘদূত যদি এ-যুগে লেখা হত, কালিদাস নিশ্চিত ভাবেই ম্যাজিক রিয়েলিজম-এর পথিকৃৎ আখ্যা পেতেন। কেবলই রােম্যান্টিসিজমএর প্রতিভূ হয়ে ইতিহাসে ঠাঁই নিতে হত না তাঁকে। কিন্তু সমসময়কে পিছনে ফেলে ভাবনা যখন এগিয়ে যায়,

1 min read
Desh
July 2, 2021

সহিষ্ণুতার অভাব ও বিভেদের রাজনীতি

ইনটলারেন্স। অসহিষ্ণুতা। বিশ্বের সর্বত্র পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অসহিষ্ণুতার মাত্রা। বিরুদ্ধ মত প্রত্যাখ্যান করা বা সমাজের ভিন্নতর আর্থসামাজিক শ্রেণিদের সযত্নে এড়িয়ে চলা,

1 min read
Desh
July 2, 2021

কবির গল্প গল্পের কবি

বহু গল্পই তাঁর আত্মপ্রতিবিম্ব, তাঁর সময়যাপন, তাঁর আনন্দ বিষাদ, তাঁর আত্মিক সংকটের এক চমৎকার জলজ দর্পণ।

1 min read
Desh
July 2, 2021

শত ভুল বিকশিত হােক

‘হে গর্দভ! আমার প্রদত্ত, এই নবীন সকল ভােজন করুন। আমি বহুযত্নে, গােবসাদির অগম্য প্রান্তর সকল হইতে, নবজলকণানিষেকসুরভি তৃণাগ্রভাগ সকল আহরণ করিয়া আনিয়াছি, আপনি সুন্দর বদনমণ্ডলে গ্রহণ করিয়া, মুক্তানিন্দিত দন্তে ছেদনপূর্বক আমার প্রতি কৃপাবা হউন।

1 min read
Desh
July 2, 2021

স্পর্শ করে থাকা বিশ্বজগৎ

তিবিম্ব পত্রিকায় ১৯৭৯ থেকে ২০২০ পর্যন্ত শঙ্খ ঘােষের নানা রচনা নিয়ে সাজানাে এই সংকলন, প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর মৃত্যুর দু-এক মাস আগে,

1 min read
Desh
July 2, 2021

বন্ধুত্বের খোঁজে গৌ ত ম ভ দ্র

পা গলা দাশু, ঘোঁতন আর পালা, হাবুল ও ক্যাবলাদের খুঁজব। কোথায়? এই সময়ে, এই দিনে? পটলডাঙার রােয়াকে না পাড়ার স্কুলে?

1 min read
Desh
May 02, 2021

মানিকদার সােল্লাস হাততালি

অ ন্ধকার প্রেক্ষালয়ে পা দিতে না দিতেই কোনও এক অচেনা দর্শক-বন্ধুর হাত আমায় টেনে নিয়ে পাশের চেয়ারে বসাল। সামনের দিকে তাকিয়েও বুঝতে পারছি, পরদায় তখন কী দেখানাে হচ্ছে, বুঝতে পারছি আর কতটুকুই বা আয়ু আছে ছবিটার! চলমান ছবিতে তখন দুঃখ-সুখের এমনই দোলদোলানি, মুহূর্তের জন্যেও নাড়াঘাঁটা করার সাহস হল না। কে আমার সঙ্গী হলেন, সেই অন্তিম লগ্নে কেই-বা সে হিসাব নেয়!

1 min read
Desh
May 02, 2021