স্মৃতির সরণি বেয়ে
Grihshobha - Bangla|July 2020
স্মৃতির সরণি বেয়ে
ঘরে ঢুকে প্রথমেই গায়ের সাদা কোটটা খুলে সােফার উপর ধপ করে বসে পড়ল বিনীতা। বড়াে করে নিশ্বাস ফেলল। আজ তার খুবই পরিশ্রম গেছে। একটা ভয়ানক কঠিন অপারেশন ছিল। অপারেশন সফল হওয়ার কোনও আশা প্রায় ছিলই । কিন্তু সফল হতে সকলে হইহই করে উঠল, সবটাই নাকি ড. বিনীতা গুপ্তের হাতযশ।

সন্ধেয় বিনীতা যখন হাসপাতালে তার নিজস্ব চেম্বারে পৌঁছােল, দুজন মাত্র রােগী অপেক্ষা করছে। সে একটু অবাক হল। যতদূর তার মনে পড়ছে, আজ কোনও অ্যাপয়েন্টমেন্ট রাখেনি বিনীতা। কিন্তু বিপদে পড়া মানুষকে ফিরিয়ে দেওয়াও নেহাত অমানবিক। বিরক্ত হলেও, বিনীতা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দুজন রােগীকে দেখে বাড়ি ফিরে আসতে চাইল। গত কয়েকদিন ধরেই খুব ক্লান্ত লাগে বিনীতার। ধারাবাহিক এত ব্যস্ততা আর পরিশ্রম নিতে পারছে না শরীর। শেষ কবে যে সে বিশ্রামের জন্য বেশ কয়কদিনের ছুটি নিয়েছিল, বিনীতা ভুলেই গিয়েছে।

রােগী দুজনকে দেখে তাড়াতাড়ি ছেড়ে দিয়ে, ব্যাগটা হাতে তুলে সে দ্রুত পায়ে লবিতে পা রেখেছে কি রাখেনি, শুনতে পেল বিনীতার নাম ধরে পাবলিক অ্যাড্রেস সিস্টেমে ঘােষণা হচ্ছে, ‘ড. বিনীতা গুপ্তকে জানানাে হচ্ছে, এক্ষুনি অপারেশন থিয়েটারে চলে আসুন।

হোঁচট খেল বিনীতা। তার মানে, আজও তার তাড়াতাড়ি বাড়ি যাওয়ার পরিকল্পনায় এখানেই ইতি। নিশ্চয়ই কোনও ইমার্জেন্সি কেস এসে গেছে। গন্তব্যের দিশা পালটে বিনীতা অপারেশন থিয়েটারের দিকে পা বাড়াল।

নিজেকে প্রস্তুত করে নিল বিনীতা। অপারেশন থিয়েটারের সং লগ্ন ঘরে বসে দ্রুত একবার রােগীর কেসহিস্ট্রিতে চোখ বুলিয়ে নিয়ে, কাগজপত্রগুলাে রেখে দিতে গিয়েও রােগীর নামের জায়গাটায় চোখ আটকে গেল বিনীতার। নামটা তার খুব চেনা। বুকটা ধক করে উঠল। তবে কি সে-ই?— জয়ন্ত?

সে মনেপ্রাণে চাইছিল তার আশঙ্কাটা যেন সত্যি না হয়। নিশ্বাস চেপে রেখে সে রােগীর চোখ বুজে রাখা শান্ত মুখে চোখ রেখেছিল। চমকে উঠল বিনীতা। এ তার একসময়ের সহপাঠী জয়ন্ত না হয়েই যায় না। কোনও সন্দেহ আর নেই তার।

বিনীতা কখনও চায়নি, এ জীবনে আবার জয়ন্তর সঙ্গে তার দেখা হয়ে যাক। কিন্তু, জীবনের আশ্চর্য ধাঁধায় সে আবার চেনা মােড়ে এসে দাঁড়াল। তফাত কেবল এইখানে, বিনীতা আজ চিকিৎসক আর জয়ন্ত রােগী হয়ে হাজির হয়েছে তার সামনে। হাসপাতালে নিশ্চয়ই অনেক আগেই আনা হয়েছিল জয়ন্তকে। কেন-না তখন ডিউটিতে থাকা ডাক্তারবাবুরা রােগের ডায়াগনােসিস করে রিপাের্ট লিখে রেখেছেন। জয়ন্তর হার্ট স্ট্রোক হয়েছে দেখে বিনীতা চটজলদি অ্যাঞ্জিয়ােগ্রাফিটাও করিয়ে নিল। তাতে হার্ট স্ট্রোকের কারণটা জানা যায়। রিপাের্টে দেখা গেল, জয়ন্তর প্রধান রক্তনালিকায় বেশ কিছু গুরুতর সমস্যা আছে। সমস্যা এতটাই গভীর যে, তক্ষুনি অপারেশন না করলে রােগীকে হয়তাে বাঁচানােই যাবে না। দুজন জুনিয়র ডাক্তার গিয়ে যখন বাইরে অপেক্ষমান রােগীর মা ও স্ত্রীকে খবরটা জানালেন, যথেষ্ট বিহুল হয়ে পড়েছিলেন তারা। কিন্তু শেষপর্যন্ত রােগীর অফিসের সহকর্মীরা তাদের বােঝানােয় কাজ হয়। উপায়ন্তর না দেখে ওরা রােগীর অপারেশনে মত দিয়েছেন।

লােকমুখে ওরা শুনেছিলেন এ হাসপাতালে ড. বিনীতা গুপ্তই সার্জারিতে সেরা। সে তাে কেবল শােনা কথা। এতদিনে আসল বিনীতাকে হয়তাে ওরা ভুলেই গেছে। ড. বিনীতা গুপ্ত, আর কয়েক বছর পিছিয়ে গিয়ে কলেজে পড়া দুই-বিনুনি বাঁধা বিনীতা কি, ওদের কাছে দুজন অন্য মানুষ? তাই হয়তাে ওরা জেদ ধরেছিলেন অপারেশন করতে হলে ছুরি-কাঁচি ধরতে হবে ড. বিনীতা গুপ্তকেই। কাকতালীয়ভাবে বিনীতাও সেসময় হাসপাতালেই।

অপারেশন থিয়েটারের আধভেজানাে দরজাটার ফাক দিয়ে জয়ন্তর মা ও স্ত্রীকে আর-একবার দেখল বিনীতা। ছেলের শােকে মূহ্যমান থাকায় জয়ন্তর মা হয়তাে বিনীতাকে চিনতে পারেননি। আর জয়ন্তর স্ত্রী’র তাে তাকে চেনার কথাই নয়। অল্পবয়সি মেয়েটি বেশ সুন্দরী। গলার আঁচল টেনে উদ্বিগ্ন মুখে জড়ােসড়াে হয়ে বসে আছে।

মেয়েটি অবশ্য খানিকক্ষণ পরেই বিনীতার কাছে এল। খুব কাছ থেকে তাকে আবার খুঁটিয়ে দেখল বিনীতা। জয়ন্তর সঙ্গে ভালােই মানানসই। মেয়েটি চোখে প্রশ্ন নিয়ে তাকাতে বিনীতা নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “কয়েকটি কাগজে আপনার সই দরকার। জয়ন্তর স্ত্রী সই করে চলে যাওয়ার পর আর বৃথা ভাবনায় সময় নষ্ট করার সুযােগ ছিল না বিনীতার। দ্রুত অপারেশন থিয়েটারের চেনা আবহে গিয়ে ঢুকল। রােগী চোখ বুজে শুয়ে আছে। অজ্ঞান। সহকারী ডাক্তারবাবুদের সঙ্গে চোখে-চোখে কথা সেরে নিল বিনীতা।

articleRead

You can read up to 3 premium stories before you subscribe to Magzter GOLD

Log in, if you are already a subscriber

GoldLogo

Get unlimited access to thousands of curated premium stories, newspapers and 5,000+ magazines

READ THE ENTIRE ISSUE

July 2020