পরেশনাথ পাহাড় পরিক্রমা
পরেশনাথ পাহাড় পরিক্রমা
শীত শেষের নরম রােদ আর বসন্তের পলাশ দুই-ই যদি একসঙ্গে উপভােগ করতে চান। —তাহলে পরেশনাথ পাহাড় হতে পারে। আপনার পরের গন্তব্য। হাতের কাছেই এমন। একটি ট্রেকিং রুটের অভিজ্ঞতা শেয়ার করছেন মানস মুখােপাধ্যায়।

এক আকাশ রােদের মাঝে, এখনও হিমেল হাওয়ার পরশ। সকাল আর ভাের রাতে একটা ঠান্ডা-ঠান্ডা আমেজ। ছড়ানাে হৈমন্তির আঁচলে ঘরছাড়ার আশকারা। এই বসন্তে প্রকৃতির রূপে পাগল হতে কোথায় যাই? মন বলল, চলাে পরেশনাথ।। আমরা তাে পুণ্যার্থী নই, তবে কেন পরেশনাথ? অতশত বুঝি না। মন চায় নতুন কিছু দেখতে। নতুন কিছু পেতে। নতুনের প্রত্যাশাতেই তাে বেঁচে থাকা। বসন্ত মানেই নতুনের আগমন। বসন্ত মানেই রঙের বাহার। বসন্ত মানেই মনের কথা প্রাণ খুলে বলা এবং শােনাও।

আসানসােল ছাড়তেই চোখ চলে গেল জানলার বাইরে। লালে লালে প্রকৃতি রঙিন। পলাশ আর শিমুল গাছগুলাে দেখছি, আর মনে হচ্ছে ট্রেন থেকে ছুটে চলে যাই। মাঠে মাঠে ছুটে চলি রঙের পরশ পেতে। অভয়বাবু গান ধরেছেন, নীল দিগন্তে ওই ফুলের আগুন লাগল। ট্রেনের ধাতব আওয়াজে গানটা ভেঙে ভেঙে মনের গভীরে অনুরণন ছড়িয়ে দিল।

জম্মু-তাওয়াই এক্সপ্রেস-এ চলেছি পরেশনাথ। সঙ্গে ভ্রমণসঙ্গীরা নির্ধারিত সময়ের আধঘন্টা পরে পৌঁছােলাম পরেশনাথ স্টেশনে। স্টেশন চত্বরেই ট্রেকার স্ট্যান্ড। এসে শুনলাম, আজ আর সার্ভিস। ট্রেকার মিলবে না। সবে সন্ধ্যা পৌনে সাতটা। অগত্যা একটা মারুতি ভাড়া করে রওনা দিলাম।

আমাদের ডেস্টিনেশন মধুবন। পথের দূরত্ব পঁচিশ কিমি। মধুবনই পরেশনাথ পাহাড়ে ওঠার বেস ক্যাম্প। মাত্র মিনিট পঁয়তাল্লিশ-এর যাত্রা পথ। তবে রাস্তা মােটেই ভালাে নয়। যাচ্ছেতাই। গা-গতর ঘেঁথলে গেল। যাত্রাপথের বাড়তি আশঙ্কা ছিল একটি রাজনৈতিক সংগঠনের ব্যাপারে। পথ চলতি যাদেরই দেখছি রাতের আঁধারে, মনে হচ্ছে এরাই বােধহয় চড়াও হবে আমাদের উপর। যাক। শেষ পর্যন্ত সাফল্যের হাসি মেখে এলাম মধুবন। ঘড়িতে তখন সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা। রাত ঠিকানা নিলাম। ‘ভােমিরাজ ভবন’ ধর্মশালায়।

মধুবনের বাজার বেশ জমজমাট । অনেকটা অঞ্চল জুড়ে ছড়ানাে মার্কেটের মধ্যেই দোকানপাট, ব্যাংক, ধর্মশালা । দিগম্বর আর শ্বেতাম্বর ধর্মশালা মিলিয়ে প্রায় ডজন খানেকের উপর । প্রতিটিতে রুমের সংখ্যা পর্যাপ্ত । প্রতিটি ধর্মশালার ভিতরেই মিলবে একটি করে জৈন মন্দির । জানা গেল শ্রাবণ মাসেই তীর্থযাত্রীর সংখ্যা সব চেয়ে বেশি হয় । ২৩তম জৈন তীর্থঙ্কর পার্শ্বনাথ । তিনি ১০০ বছর বয়সে শ্রাবণ মাসের শুক্লাষ্টমীতে এই । পাহাড়েই এসে দেহ রাখেন । তাঁর নামানুসারে এই পাহাড়ের নাম হয় পরেশনাথ পাহাড় ।

তাছাড়া ২৪ জন তীর্থঙ্করের মধ্যে মহাবীর ছড়া । সকলেই তপস্যাস্থল হিসাবে এই পাহাড়কেই বেছে নেন । সেই জন্যই জৈনদের কাছে এই স্থানের মাহাত্ম্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । রাতে ধর্মশালায় মিলল না খাবার । জানা গেল, জৈন ধর্মাবলম্বীরা সূর্যাস্তের পর আর আহার করেন না । অগত্যা বাইরের হােটেলই ভরসা । রুটি, এঁচোড়ের তরকারি আর মিষ্টিসহ ডিনার সারা হল । সারা দিনের জার্নিতে ক্লান্ত সকলেই । তাই শােয়ার সাথে সাথে ঘুম আসতে দেরি হল না ।

সময় মেনেই অ্যালার্ম বেজে উঠল । রাত তখন আড়াইটে । ধড়ফড় করে উঠে পড়লাম । আবার চোখ । কচলে শুয়ে পড়লাম, ঘুমের রেশ টেনে । ইতিমধ্যে ঘুমকে তুড়ি মেরে প্রত্যেকেই উঠে পড়েছে । প্রস্তুতিও নিয়ে ফেলেছে অনেকটা । শেষমেশ ঘুমের জনগণমন বাজিয়ে আমাকেও অতিকষ্টে উঠতে হল । মুখ হাত ধােওয়ার পর প্রাতরাশ ।

প্রত্যেকে এক গেলাস করে ছাতুর শরবত খেয়ে নিলাম। যেন কুস্তির আসরে নামতে যাচ্ছি। রাস্তার রসদের জন্য নেওয়া হল কিছু ড্রাই ফুড। ইষ্টনাম স্মরণ করে রওনা দিলাম। ঘড়িতে তখন ভাের চারটে। কেউ কেউ সঙ্গে নিলেন একটা করে লাঠি। পথ চলার সুবিধার্থে। বাইরে নিকষ কালাে অন্ধকার। কেবল ঠক-ঠক লাঠির কোরাস আওয়াজ। দল বেঁধে তীর্থযাত্রীরা চলেছে পাহাড় পরিক্রমায়। সেই অন্ধকার পাহাড়ি পথে সঙ্গী হলাম আমরাও।

লােকালয়ের সঙ্গে সম্পর্ক চুকিয়ে এসেছি অনেক আগেই । অন্ধকার ঠেলে এগােচ্ছি । পথ ক্রমশ চড়াই হচ্ছে । আকাশে দ্বিতীয়ার চাঁদ । সঙ্গে জানা অজানা হাজার নক্ষত্র । চেনা গণ্ডিতে কালপুরুষ, সপ্তর্ষি মণ্ডল । উজ্জ্বল শুকতারাটা যেন, আকাশের গায়ে ঝুলিয়ে দিয়েছে কেউ ।

articleRead

You can read upto 3 premium stories before you subscribe to Magzter GOLD

Log-in, if you are already a subscriber

GoldLogo

Get unlimited access to thousands of curated premium stories and 5,000+ magazines

READ THE ENTIRE ISSUE

February 2020