হে চিরপ্রবাস।
হে চিরপ্রবাস।
এই সেই কুতুব মিনার, এই সেই বুলন্দ দরওয়াজা আর এই লালকেল্লা— দিল্লি শহরের আরও নানা চিহ্নের পাশাপাশি এরাও দাঁড়িয়ে আছে ঠায়।

এদেরই সঙ্গে ইদানীং জুড়ে গেল দিল্লির নতুন চিহ্ন— পুড়ে যাওয়া। বেশ কিছু মহল্লা, উজাড় গৃহ, দোকানপাট। নাম ধরে ধরে টেনে বের। করে আনা মানুষের দেহ ঘিরে তপ্ত কলরােল। এসবই এখন দিল্লির। সঙ্গে জড়িয়ে গেছে ওতপ্রােতভাবে। ফেব্রুয়ারি মাসের কয়েকটি দিন। সারা দেশ ও দুনিয়া তাকিয়ে দেখল, খােদ রাজধানীজুড়ে মহল্লার পর। মহল্লায় এক-একজন লােককে ঘিরে ধরে আছে অস্ত্রধারী অন্য অনেকে। নৃশংস আঘাত নেমে আসছে শরীরজুড়ে। ছবির মতাে সেসব দৃশ্য পাকাপাকিভাবে আঁকা হয়ে যাচ্ছে দিল্লির মানচিত্রে। এখন সবার জানা সেসব কাহিনি।

কী হবে এমন কালে নিবন্ধ লিখে— এ এক নিরেট প্রশ্ন, যার কোনও যথাযথ উত্তর নেই। আরও কত দিস্তে কাগজজুড়ে ক্রমাগত জমে উঠবে অক্ষরের রাশি, অজস্র বিশ্লেষণ, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, বারবার স্মরণ করা হবে এই দেশ কবীরের লালনের গাঁধী বা রবীন্দ্রনাথের এবং সেই স্মরণ থেকে চলকে উঠবে বিস্ময়— কী করে এমন হল, একই বৃন্তে দুই কুসুমের মিঠে গালগল্প তবে কি মিথ্যে হয়ে গেল! এইসব ভেবে ভেবে এবং বারবার লিখে আদৌ যে কিছু হয় না, সে কথা তাে বােঝা গেছে কবেই। কবিতা ও গানের রকমারি কোটেশন যে কোনওদিন একজন। ঘাতকের হাত থেকে কেড়ে নিতে পারেনি অস্ত্র, একটিও মানুষের মৃত্যু ঠেকাতে পারেনি কখনও — উজাড় হয়ে যাওয়া কোনও একটি বসতের জন্যে গড়ে দিতে পারেনি কোনও নতুন ঠিকানা... তা আমাদের সকলেরই জানা । কত শত নির্বিকার প্রবন্ধ এবং কবিতামালা উড়ে গেছে দাঙ্গাবিধ্বস্ত ঠিকানার উপর দিয়ে, কোথাও কাউকে কিছুমাত্র স্পর্শ না করেই । এই সব সম্মিলিত । | ব্যর্থতার কথা নতুন কোনও লেখার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে স্থির আর নিরেট । দেওয়ালের মতাে । দাঁড়িয়েই থাকে ।

এসব নিশ্চিত জেনেও, তবু এই যৎসামান্য লেখার কারণ কী? অন্য কিছু নয়, এ লেখার কারণ শুধুমাত্র একচিলতে হাহাকার আর আর্তনাদ লিপিবদ্ধ করা। এটা কেবল জানানাে, অন্য কোথাও, দিল্লি থেকে বহুদূরে, বিলাপরত আছে কেউ কেউ, একেবারে অশ্রুত ছিল না মধ্যরাতে বাড়ি ছেড়ে চুপচাপ নিরুদ্দেশে চলে যাওয়া মানুষজনের ভীতকাতর পায়ের আওয়াজ। একটি দেশের একেবারে হৃৎপিণ্ডে গেঁথে গেছে বিশ্বাসঘাতী তীক্ষ অস্ত্র— সেই ক্ষতদাগের পাশে বসে রােদনের জন্য অবশিষ্ট আছে কিছু লােক। সমস্ত হত্যাকে বীভৎস বলে চিহ্নিত করার জন্য যে-ক’টি লােক প্রয়ােজন হয়, তা এখনও ফুরােয়নি। হতাশার জন্য নয়, এ লেখা রােদনের, বিলাপের আর । আর্তনাদের দায়িত্ব নিতে চায়। জানাতে চায় মৃতদের পক্ষে সে রয়েছে, আহতের সঙ্গে দেশের মাঝখানে চিরপ্রবাসীর পাশে গিয়ে সে দাঁড়াতে চায়— প্রতিকারের কোনও নির্মোহ বিধান বা ব্যবস্থা করা তার অসাধ্য, সে শুধু বলবে, এই আমি রয়েছি বেদনা লিখে রাখার কাজে। এই আমি কাঁদছি আর দেখছি আমারই প্রতিবেশী আঙুল তুলে দেখিয়ে দিচ্ছে আমার ধর্ম, হত্যাকারীকে চিনিয়ে দিচ্ছে আমার ঘরদোর, আমার কোল থেকে টেনে। নিয়ে যাচ্ছে আমারই আত্মজকে, দেখছি আর সাজিয়ে রাখছি দৃশ্যের পর দৃশ্য। লিখে রাখছি কীভাবে তােমার ঘৃণা আর অবিশ্বাসের স্পর্শ আমাকে অস্তিত্ববান করে তুলছে, জানিয়ে দিচ্ছে আমি আছি, আমরা যাইনি মরে আজও...এই তাে তােমার অস্ত্র ধাবিত হল আমারই অভিমুখে, এইমাত্র ধারালাে বল্লম ছুঁয়ে দিল আমার ফুসফুস, একদলা বাতাস বেরােল ছিটকে, কান্নার মতাে, গােঙানির মতাে...এই যে আমি ক্রমশ পেরিয়ে যাচ্ছি আমার বাল্যকাল, মহরম, দসেরা, ছট...এই পেরােলাম রথতলা, মসজিদ, মহল্লার কোণ ঘেঁষে মুদির দোকান, লাটু আর ঘুড়ির সম্ভার, আব্ব আর হরিহরকাকার গলাগলি ভাব...এই পেরােচ্ছি ইশকুলবাড়ি, মহিলা সমিতির অফিসঘর আরও কত স্থান আরও কত কাল....

এইসব স্থানই কি দিল্লির? না তাে? এসব ছড়িয়ে আছে এ দেশের আরও বহু আনাচেকানাচে।

দুই

articleRead

You can read upto 3 premium stories before you subscribe to Magzter GOLD

Log-in, if you are already a subscriber

GoldLogo

Get unlimited access to thousands of curated premium stories and 5,000+ magazines

READ THE ENTIRE ISSUE

March 17, 2020