চিরকালের চত্বরে
চিরকালের চত্বরে
ক্লোদ মােনের জিভের্নির চমৎকার গার্ডেনটি বড্ড মনে ধরেছিল ক্যাথারিনের। ঝুপসি ঝুপসি ছায়াময় ঝােপ, ফুলে ফুলে ছয়লাপ, সারা কন্টিনেন্ট উজাড় করে ফুল এনেছেন শিল্পী, এন্তার ফার আর ঝাউগাছ। আঁকাবাঁকা পুলে লিলি আর লিলি। তাঁর বরাবরই বাগিচার শখ। যেখানে যান উদ্যানের খোঁজ করেন। এবারেও টেন্ডার ডেকেছিলেন, কোটেশন যা এসেছে তার মধ্যে এই উদ্যানটি বড় পছন্দ হল। সইসাবুদ করতে যাচ্ছেন, এমন সময়ে আর-একটি কোটেশনের লেফাফা হাত থেকে । অসাবধানে খসে পড়ল। আর তার ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন এক অনিন্দ্যসুন্দরী।

“ঔর দোচ্চার দেখিয়ে না জরা!” কটাক্ষে তাঁর দিকে তাকিয়ে সপ্রতিভ স্বরে বললেন আগন্তুক।

“আপনি কে সেটা তাে ঠিক..”

“আমি এক বাগিচাবিশারদ, মেহের মেরি নাম, মেহেরুন্নিসা।” মেহেরের উদ্যানটি অবশ্য আরও বড়, এবং সুন্দর সুন্দর ফোয়ারায়। সজ্জিত, ছােট ছােট কুণ্ডি রয়েছে, তাতে ফুল, থেকে থেকেই কুঞ্জ, রঙিন ফুল তাে আছেই, তারও ওপর নানা পুষ্পের মনমাতানাে গন্ধে উতলা। হয়ে উঠলেন ক্যাথারিন। শালিমার বাগ! কত রকমের গাছ, পপলার, বার্চ, দেওদার, পাইন, চারদিকে ইতস্তত দাঁড়িয়ে রয়েছে ছােট-বড় চিনার গাছ। শরৎ-হেমন্তের স্তিমিত আলােয় নারাঙ্গি রঙের চিনারগুলির প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে কথা শুরু হল।

“ কথায় যা বুঝলাম, আপনি তাে এমপ্রেস! নিজের প্ল্যান করা গার্ডেনটি বেচে দিতে চাইছেন? কেন? ” বিস্মিত গলা ক্যাথারিনের মেহের একটু হাসলেন, “জরুর! মােহরের দরকার মেহেরের।” “সম্রাজ্ঞীর মােহরের অভাব?”

বিষন্ন হেসে সুন্দরী বললেন, “আমি আর সম্রাজ্ঞী নই যে! হলে তাে কথাই ছিল না। মেরা শৌহর বাদশা সেলিম জাহাঙ্গিরের ইন্তেকাল হয়েছে। আর স্বামী মারা গেলে কোন স্ত্রীর আর কোন সম্পদ বজায় । থাকে, বলুন!”তেতাে হাসি হেসে ক্যাথারিন বললেন, “জীবিত থাকলেই-বা কী!” একপলক তাঁর দিকে তাকালেন মেহের, একটা সহানুভূতির দৃষ্টি ফুটে উঠল তাঁর চোখে।।

বললেন, “লেকিন বাদশা সেলিমের যােগ্য একটি সমাধি গড়তে চাই। মেরে লিয়ে উওলােগ তােষাখানা বন্ধ করে দিয়েছে। ফরমান আভি কাশ্মীর তক পৌঁছয়নি তাই... বুঝলেন বহেন, আমারই নকশা করা নানা জেবর, জরি রেশমের ব্রোকেড কাপড়, পেশােয়াজ আচকান কামিজ, নানারকম ইত্বর, তসবির, যা যা আমি নিজে তৈরি করেছি বা ফরমায়েশ করে তৈরি করিয়েছি, তা ছাড়াও বাগিচা ভর্তি পােষা নাচনেওয়ালি মাের, সুরেলি বুলবুল, মিঠি মিঠি বােলিওয়ালি তােতা— সব বেচে দিয়েছি।”

“ আপনি তাে দেখছি অশেষ গুণবতী... গার্ডেনস, পেন্টিংস, ড্রেস, ফ্যাব্রিক, জুয়েলারি... গুড হেভেনস! তা স্বামীর সমাধির জন্য এত কেন? এই দেখুন না, আমিও তাে এক রানিই, কিন্তু যে মানুষ ব্রাদার ইন ল । থাকাকালীন আমার প্রেমে এত মত্ত ছিল যে, কোনটা গােড়ালি কোনটা মুন্ডু বুঝতে পারত না, সে ই এখন অ্যান বােলিন নামে আমারই মেড এক অমাত্য কন্যার প্রেমে এমন মত্ত যে, আমাকে তালাক দেওয়ার জন্যে ধর্মটাকে পর্যন্ত বেঁকিয়ে- চুরিয়ে তার ফ্যাকড়া বের করে ছাড়ল। আমি তাে এখন নির্বাসিত। আর জানেন, ক’দিন যেতে না-যেতেই ওই অ্যান-এর মুভুটিও তিনি ছ্যাডাং করে কেটে নিলেন। আমারও এক কন্যা, ওই অ্যানেরও এক কন্যা। সেটাই আসল অপরাধ কি না এখনও বুঝতে পারিনি।”

“হায়, আমারও তাে একটা বেটিই,” মেহের। বললেন, “তাও সেলিমের নয়। লাডলিকে ঔর। এক শাহজাদা শাহরিয়রের সঙ্গে বিয়ে দিলাম।। তা সে খুররমের সঙ্গে এঁটে উঠতে পারলে তাে? আমার আর সেলিমের বেটা হলে কি আচ্ছা হত? হায় আল্লা, ওই খুররম আগে তাকে খুন করাত। তবে আপনার দুঃখে আমার চোখে পানি আসছে। বহেন, আপনাদের বােধ হয় একের বেশি শাদি নেই, না? দেখুন, প্রথম কথা আমার আরও অনেক সৌতন ছিল। বাদশা। মহলে তা ছাড়াও থাকে নাচনি, বাঁদি... বুঝতেই পারছেন কেমন নাচনি আর কেমন বাঁদি... কিন্তু আমার সেলিম জীবনের শেষদিন পর্যন্ত আমাকে সম্মান দিয়েছে, সব সাধ পূর্ণ করেছে, সে আমাকে নূর জঁহা নাম দিয়েছিল। সে-ও কিন্তু আমাকে পাওয়ার জন্য আমার প্রথম স্বামীকে কোতল করায়। সৌতন কি বেটা খুররম প্রথম দফাতেই আমাকে সব খাস জায়গা থেকে সরিয়ে দিল। তারপর হাত বাড়িয়েছে আমার নিজের সম্পত্তিগুলাের দিকে। নিজের আব্বার জন্যে একটা সমাধি গড়ার খর্চ করতেও সে রাজি নয়। অথচ বিবি, যে নাকি আবার আমারই ভাইয়ের বেটি, সেই মমতাজের গােরের ওপর। তাজমহল বলে সংমর্মরের একটা শানদার মকবরা তৈরি করাচ্ছে। সেটি নাকি। পৃথিবীর সাতওয়া চমক।”

একটি স্লান সুন্দরী এই সময়ে চিনার গাছের ওদিক থেকে পায়ে পায়ে এগিয়ে এল। পরনে সারারা ও হাতায় গলায় রেশম ও জরির জারদৌজি কাজ করা কামিজ। অলংকারও প্রচুর। মেয়েটি ধীর পায়ে আসছিল, অত গহনা যেন বইতে পারছে না। “মেহের বুয়া,” সে মােছা মােছা গলায় বলে উঠল, “ওই তাজমহল। আমার জন্যে না গাে, বরং বলতে পারাে তাজমহলের জন্য আমি।” “আরে, এ কী কথা! খুররম আমার দুশমন, কিন্তু তােকে তাে চোখে হারাত রে! অমন কথা বলিস না, তা তােকে এত ফ্যাকাসে লাগছে কেন?”

“ওই যে চোখে হারাত। মােট তেরােবার আঁতুড়ে গিয়েছি, প্রত্যেকবার জান খতরে মে। ডাক্তার বলে দেন, আর সন্তান হলে বাস। খতম। শরীরে খুন একদম নেই। তা চোদ্দোতম সন্তান এল। আমিও চলে এলাম। বুয়া সে যে । কী কষ্ট, তিরিশ ঘণ্টা ধরে কাটা ছাগলের মতাে দাপিয়েছি, আটত্রিশ বছরের জীবনে চোদ্দোবার।”

articleRead

You can read upto 3 premium stories before you subscribe to Magzter GOLD

Log-in, if you are already a subscriber

GoldLogo

Get unlimited access to thousands of curated premium stories and 5,000+ magazines

READ THE ENTIRE ISSUE

March 02, 2020